Sun. Nov 30th, 2025
উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের আশার আলো ‘আইএসসিএইচভি’ প্রকল্পছবি : গণপ্রহরী

কায়সার রহমান রোমেল : উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের আশার আলো ‘আইএসসিএইচভি’ প্রকল্প। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা বহুদিন ধরে এক নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। বছরের পর বছর ধরে পুনঃপুন বন্যা, নদীভাঙন আর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে। গাইবান্ধা ও বগুড়ার মতো জেলায় যেখানে মাটির উর্বরতা থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে ফসলের ক্ষতি ঘটে প্রায় প্রতি মওসুমেই, সেখানে কৃষিকাজ হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত এক জীবনসংগ্রাম। এসব এলাকার অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক, যারা উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পান না, আবার বাজারে প্রবেশাধিকারও থাকে সীমিত। এ বাস্তবতায় তাদের জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ‘আইএসসিএইচভি প্রকল্প’ বা বিল্ডিং অ্যান ইনক্লুসিভ অ্যান্ড সাসটেইনেবল সাপ্লাই চেইন ফর রেস্পন্সিবিলি প্রোডাক্ট হাই-কোয়ালিটি ভেজিটেবল।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুর উপজেলাসহ বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় এ আর মালিক সিডস প্রাইভেট লিমিটেড এবং জার্মানির ডিইজি ইমপালস-এর অর্থায়নে অর্গানাইজেশন অব ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস ফর ডিস্ট্রেসড (ওডিএসডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সংগঠিত করতে পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা অবলম্বন। এছাড়া মৃত্তিকা সম্পদ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ওয়াফেন রিসার্চ ল্যাব, স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং সমবায় বিভাগ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা প্রদান করছে। মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের সংগঠিত করে দায়িত্বশীল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা, ফসলোত্তর ক্ষতি হ্রাস করা এবং তাদের উৎপাদিত সবজি সরাসরি লাভজনক বাজারে পৌঁছে দেওয়া। প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করে এই যাত্রা শুরু হয়, যাদের অধিকাংশই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছিলেন।

প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অর্জনগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয় বরং কৃষকের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই হাজার চারশো দলীয় সভা, যা কৃষকদের ভেতরে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছে। একসময় যারা আধুনিক কৃষি পদ্ধতির নামই শুনতেন না, তারা এখন নিজের জমিতে সেই পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করছেন। চার হাজার কৃষকের মাটি পরীক্ষা করে সার সুপারিশমালা ও পানি পরীক্ষা করে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, উৎপাদনকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আপদ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কৃষকদের সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও ছয়শ ব্যাচে পাঁচ হাজার কৃষককে দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ, যার বিষয় ছিল টেকসই কৃষি, ফসলোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানদ-ে স্বীকৃত উত্তম কৃষি চর্চা বা গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি)। প্রশিক্ষণ শেষে কৃষকেরা শুধু উৎপাদনেই নয়, সংরক্ষণ ও বিপণনেও নতুন কৌশল রপ্ত করেছেন।

আরও পড়ুন- গোপন নথি নয়, নাগরিকের শক্তি

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই প্রকল্পের মাধ্যমে আশি জন কৃষক গ্লোবাল জিএপি প্রত্যয়ন পেয়েছেন। এটি শুধু একটি সনদ নয় বরং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের দরজা। চলতি বছরের মধ্যেই আরও এক হাজার কৃষককে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামারদহ ইউনিয়নের মশালমারা গ্রামের কৃষক মো. শফিকুল আলম বলেন, ‘আগে আমাদের সবজি কেবল স্থানীয় হাটেই বিক্রি হতো। দামও দিত দালালরা। এখন শুনছি আমাদের ফসল বিদেশেও যেতে পারে। ভাবতেই গর্ব লাগে।’

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রদর্শনী খামার। কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানোর জন্য চারটি উপজেলায় গড়ে তোলা হয়েছে চারটি বড়ো প্রদর্শনী খামার এবং তিনশো মিনি খামার। ইতোমধ্যে পঁচাত্তরটি প্রদর্শনী সফরে কৃষকেরা সরাসরি শিখেছেন কীভাবে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি মাঠে প্রয়োগ করতে হয়। নারী কৃষকরাও এখানে সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নারী কৃষক মিনি বেগম বলেন, ‘প্রশিক্ষণে শিখেছি কীভাবে কম কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। আমাদের সবজি এখন টাটকা থাকে বেশি দিন, আর বাজারে বিক্রিও ভালো হচ্ছে।’

আরও পড়ুন- শ্যামপুর চিনিকল’ আখ চাষিদের মাঝে শঙ্কা কাটছেনা

উৎপাদনের পর ফসলের সঠিক দাম পাওয়ার জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে কার্যকর উদ্যোগ। ইতোমধ্যে চালু হয়েছে আটটি নিরাপদ সবজি সংগ্রহ কেন্দ্র। এসব হাবের মাধ্যমে কৃষকেরা দালালের কাছে নির্ভরশীল না হয়ে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে পারছেন। ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় কৃষকদের জীবনে এসেছে স্বস্তি। আগে যেখানে ফসল বিক্রির পর হাতে থাকত অল্প কিছু টাকা, এখন সেখানে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়ায় সংসারের খরচ মেটানো সহজ হয়েছে।

আরও পড়ুন- ক্ষমতাবানদের সন্তানরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েনাহেতু শিক্ষক সংকট উপেক্ষিত–

কৃষকদের সংগঠিত করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে চারটি সমবায়, যার মধ্যে তিনটির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। এসব সমবায় কেবল উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রেই নয়, নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকেরা এখন নিজেরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং সমষ্টিগতভাবে বাজারে প্রবেশ করছেন।

প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও বেশি আশাব্যঞ্জক। নির্মাণাধীন অত্যাধুনিক সবজি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র সম্পন্ন হলে এটি হয়ে উঠবে দেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের এক মাইলফলক। এখানে থাকবে স্বয়ংক্রিয় বাছাই, গ্রেডিং, পরিষ্কার এবং প্যাকিং প্ল্যান্ট, চারশো মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার পেঁয়াজ সংরক্ষণ সুবিধা, আম শুকানো ও বিটরুট প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট এবং আধুনিক সবজি সংরক্ষণ ব্যবস্থা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পণ্যের শনাক্তকরণ বা ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা, যা আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ ও গুণগতমানসম্পন্ন সবজি রপ্তানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এই প্রকল্পের প্রতিটি পদক্ষেপ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য, জেন্ডার সমতা, দায়িত্বশীল উৎপাদন এবং অংশীদারিত্বÑ এসব ক্ষেত্রেই সরাসরি অবদান রাখছে আইএসসিএইচভি প্রকল্প। নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ প্রকল্পকে করেছে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক। শুধু কৃষকদের আয় বৃদ্ধি নয়, খাদ্যের অপচয় রোধ ও নিরাপদ সবজি সরবরাহের মাধ্যমে ভোক্তারাও উপকৃত হচ্ছেন।

আরও পড়ুন- ডেঙ্গু আতঙ্কের মাঝে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের বেঙ্গুলিয়া গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘদিন ধরেই কৃষি উৎপাদনে টিকে থাকার লড়াই করে আসছেন। আগে মওসুমভিত্তিক সবজি চাষ করলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়ে যেত। এখন আইএসসিএইচভি প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি নিরাপদ সবজি উৎপাদন করছেন। তাঁর উৎপাদিত আলু সংগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে সরাসরি বাজারে যাচ্ছে। এর ফলে তিনি শুধু ন্যায্যমূল্যই পাচ্ছেন না বরং প্রতিবছর আয়ও বাড়ছে।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের তাতীপাড়া গ্রামের মরিচ চাষি সাহারুল মিয়ার ভাষায়, ‘আগে দুশ্চিন্তায় দিন কাটত, ফসল টিকবে কি না তা নিয়ে ভয়ে থাকতাম। এখন শিখেছি কীভাবে জমি প্রস্তুত করতে হয়, কীভাবে সঠিক সময়ে সার ও পানি দিতে হয়। আমাদের উৎপাদিত ফসল এখন শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শিখেছি।’

বগুড়ার শিবগঞ্জের দেউলি ইউনিয়নের হরিপুর ভরিয়া গ্রামের কৃষক মো. সাইফুল গ্লোবাল জিএপি প্রত্যয়ন পাওয়া কৃষকদের একজন। তাঁর চাষ করা ফসল এখন আন্তর্জাতিক মানের হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে কৃষিকে শুধু টিকে থাকার পথ ভাবতাম, এখন বুঝতে পারছি সঠিক পদ্ধতিতে এটি লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা। গ্লোবাল জিএপি সার্টিফিকেশন আমাকে সেই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। গ্যাপ পদ্ধতি শেখার পর আমার সেচ খরচ কমেছে, ফলনের মান বেড়েছে এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাচ্ছি। এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড়ো সাফল্য।’

আরও পড়ুন- গাইবান্ধার উন্নয়ন: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

গাইবান্ধা ও বগুড়ার সেইসব গ্রাম এখন আর শুধু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভরপুর নয় বরং নতুন আশায় উজ্জ্বল। কৃষকের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের সুর, মাঠে দেখা যাচ্ছে নতুন সবুজের ছোঁয়া। প্রকল্পের সাফল্য প্রমাণ করছে, সঠিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ একত্রে হলে দুর্যোগপীড়িত অঞ্চলও হয়ে উঠতে পারে উন্নয়নের মডেল।

ওডিএসডি সংস্থার প্রধান নির্বাহী এবং আইএসসিএইচভি প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ সাদেকুল ইসলাম গোলাপ বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য আইএসসিএইচভি প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন কর্মসূচি নয় বরং জীবন পরিবর্তনের গল্প। যারা একসময় মনে করতেন কৃষিকাজ কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রাম, তারাই আজ দেখছেন কৃষি হতে পারে নিরাপত্তার, স্বপ্নের, এমনকি বৈশ্বিক বাজারে অংশগ্রহণের হাতিয়ার। যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে, তবে এই অঞ্চলের কৃষকরা শুধু খাদ্যে স্বনির্ভরই হবেন না বরং বাংলাদেশকে নিরাপদ ও গুণগতমানসম্পন্ন সবজি রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্ব বাজারে নতুন পরিচয়ে তুলে ধরবেন।’

আরও পড়ুন- স্মার্ট প্রকল্পের স্মার্ট দুর্নীতি : বঞ্চিত শুধু কৃষক

প্রকল্প এলাকায় কৃষকরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে টেকসই কৃষি কেবল তাদের জীবিকা নয় বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়। আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র চালু হলে স্থানীয় কৃষিপণ্য আরও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এর ফলে শুধু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিই নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *