গণপ্রহরী রিপোর্ট : মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার অনুগত উগ্র ইহুদিবাদী ইসরাইল, ইরানে যে ধবংসাত্মক আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছে, সেই যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইতিমধ্যেকার ধবংসাত্মক যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলের নিক্ষেপিত বোমা আঘাত হেনেছে জ¦ালানী ডিপোতে। তেলে জ¦লছে আগুন। ইরানবাসী আগুনের লাল শিখার তাপে ভীত না হয়ে, তেজদীপ্ত হচ্ছেন। আর সেই আগুনের ‘বিষাক্ত কালো ধোঁয়া’ বাতাসে ভেসে শো শো শব্দের মাধ্যমে আহ্বান জানাচ্ছে-‘ইরানে, মার্কিন-ইসরাইলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান’। কেননা, বর্তমান বিশ্ব জ¦ালানি ও প্রযুক্তি নির্ভর। আর প্রকৃতিরই দান ইরানের তেলের ভান্ডার। বিশ্ববাসীর প্রত্যেক জাতি, ধর্ম-বর্ণের মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য প্রয়েজন জ¦ালানি। তাই প্রকৃতিকে নিরাপদ রেখে তেল সম্পদর্ ক্ষায় বিশ্বের দেশে দেশে, শান্তিপ্রিয়-প্রকৃতিপ্রেমী বিশ্ববাসীকে প্রত্যেক দেশে ‘ধর্মভিত্তিক নয়, মানুষের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে’। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সকল মানুষের ঐক্য গড়ে তুলুন এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলে ইরানীদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং দাঁড়ান। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দিচ্ছে- ‘সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ। আর যুদ্ধ মানেই ধবংস’। ফিলিস্তিনের পর ইরানে সেই যুদ্ধ শুরু করেছে-বিশ্বব্যাপী একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এ যুদ্ধকে নিন্দা করুন, ঘৃণা করুন। আওয়াজ তুলুন-আমরা ‘যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই’।
বিশ্বের অসংখ্য মানুষের সহজ সরল বিশ্বাস বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসলীলা থেকে শিক্ষা নিয়ে, কোনো দেশে সরাসরি হামলার পথ পরিহার করে। দেশে দেশে শোষক শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারীদের মধ্য থেকে বা পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত দলকে ক্ষমতাসীন করে অর্থাৎ দালাল-সেবাদাস-সরকার গঠন করে, আধিপত্য বিস্তার ও বাজার দখলের পথ বেছে নেয় বটে। তার অর্থ এই নয় যে, আক্রমণ করবে না। ভূরাজনীতি নির্ভর বিশ্বপরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যেই দেশে দেশে আধিপত্য বিস্তার ও বাজার দখল নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে এবং একক কর্তত্ব প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতা লোভীরা কৌশলী ছলছুতোকে কেন্দ্র করে আক্রমন করে,করছে ও করে চলছে। এজন্য শক্তির প্রভাব বিস্তারে ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা লুটে নেয়ার পাশাপাশি আধিপত্য ও বাজার দখলের প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখছে। সেই সাথে কূটনৈতিক কূট-কৌশলী পদক্ষেপ নিয়ে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে সরকার গঠনে ভূমিকা রাখার তৎপরতা অব্যাহত রেখে আসছে। এবং সাম্রাজ্যবাদী অন্যান্য দেশের প্রতিও তীক্ষè নজর রাখছে।
এমন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের ঘৃণ্য লিপ্সার অংশ হিসেবে- ট্রাম্পের মার্কিন আধুূনিক ইতিহাসে অবিশ্বাস্য ও বিরল ঘটনা হলেও, লাতিন আমেরিকার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তাঁরই দেশে বল প্রয়োগে এক সন্ত্রাসী অভিযান চালিয়ে ধরে নিয়ে যায় এবং ভেনেজুয়েলায় নতুন সরকার গঠন করে। ইরানেও ট্রাম্পের একইরূপ ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় তার অনুগত সরকার গঠনকল্পে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী, তাঁর স্ত্রী, কন্যা নাতনি এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমোদিনিজাদসহ বেশ কয়েকজন র্শীষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাকে হত্যা করে। সর্বশেষ খবর মতে এক হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছেন ও আহত হয়েছেন ১৮০০০ জনেরও বেশি মানুষ এবং ৪৩ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ধবংস করা হয়েছে। যদিও কোনো দেশের অভ্যন্তর আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন বাহিনীর ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের এ অভিযান এবং হত্যা ও ধবংসযজ্ঞ চালানো ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্থুল লংঘন বা আন্তর্জাতিক রেড লাইন অতিক্রম’। এতে করে, বিশ্বের জানি দুষমন খ্যাত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নতুন প্রজন্মের সামনে নিজেকে নতুনভাবে শক্র হিসেবে হাজির করলো এবং ক্ষমতার দাম্ভিকতা দেখালো।
কিন্তু কথিত শান্তি আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায়, ইরানের জনগণসহ বিশ্বের শান্তিকামী জনগনের বিশ্বাসের সাথে মার্কিন এ মূহুর্তে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইরানে অভিযান চালাচ্ছে কেন। কারণ, ইরানে ক্ষমতাসীন ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট শাসকদের পতন ঘটিয়ে তার দালাল-পুতুল সরকার গঠনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘ সূত্রিতার মুখে। উপরন্ত তেল সম্পদে সমৃদ্ধ ইরানে আধিপত্য বিস্তার ও বাজার দখলের যুদ্ধে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে তেল সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে। অপরদিকে, সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও চীন এই যুদ্ধে আক্রান্ত ইরানের সমর্থনে থাকলেও রাশিয়া ব্যস্ত ইউক্রেন দখল নিয়ে আর চীন এখনো ইরানসহ মধ্যেপ্রাচ্যে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত। এ পরিস্থিতিতে অস্ত্র সরবরাহ ছাড়া সরাসরি ভূমিকা নেয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া একই রেড লাইনে। তদসত্বেও মার্কিন-ইসরাইলের আগ্রাসন ও ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে এ মূহুর্তেও অনুমান। যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতির উপরই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ভরশীল।
পক্ষান্তরে, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ মুসলমান প্রধান দেশেই মার্কিনের সামরিক ঘাটি রয়েছে, মার্কিন স্বার্থ প্রাধান্যের বন্ধুত্বও রয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়ক শক্তি হিসেবে তথ্য প্রচার-প্রকাশসহ মার্কিনের পক্ষেই ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশসহ মুসলমান প্রাধান্যের দেশগুলোর অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় আদর্শগতভাবে সুন্নীহ ও শিয়া মতাবলম্বী কারনে সৌদিপন্থী ও ইরান বিরোধী, যা বিবেচ্য। উপরন্ত, চারদশক কালের ইরানের ধর্মবাদী ফাসিষ্ট শাসনের বিরুদ্ধে ইরানে জনগণের এক পক্ষের আন্দোলন-সংগ্রাম চলে আসছে। অর্থাৎ সকল সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য ও বাজার দখলের অসৎ উদ্দেশ্য বা পরিবল্পনা পাশ কাটিয়ে, বিশেষত উন্নয়ন সহযোগীতার নামে পুঁজি বিনিয়োগের পাশাপাশি, ‘সাম্রাজ্যবাদীরা আধিপত্য বিস্তার ও বাজার দখলের ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টিতে, জাতি-ধর্ম ও বর্ণ ভেদাভেদকে কেন্দ্র করে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দালাল সরকার গঠনে সুকৌশলে ভূমিকা পালন করে থাকে’-এটাই ইতিহাস বিশ্লেষকদের বিশ্লেষন। ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ও আন্দোলনকারীদের পক্ষে, মার্কিনের ভুমিকা যতটাই থাক এবং আন্দোলকারী পক্ষে ইরানী জনগণের অংশগ্রহনকারীর সংখ্য কম-বেশী যাই হোক-এটা ইরানী শাসকদের জন্য একটি দুর্বলতা। যে দুর্বলতার সদ্ব্যবহার করছে মার্কিন-ইসরাইল। উপরন্ত, ইরানী শাসক গোষ্টি দেশের অনেক প্রগতিশীল যুব-ব্যক্তিকে হত্য করেছে, নির্যাতন করেছে। যার বিরুদ্ধে ইরানের নারী সমাজসহ ছাত্র-তরুণদের জোরদার আন্দোলন, সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দমন করে আসছে। ফলে জনগণ স্বভাবজাত কারণেই ফ্যাসিবাদী-নির্যাতনমুলক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয়েছেন। সেহেতু আমাদের দেশের ধর্মবাদী (ধর্মপাণ সহজ-সরল মানুষ) মৌলবাদীরা মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর উপর গুরুত্বারোপ করলেও মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না ।
তবে মানুষ হত্যা ও মানুষের রক্তঘামের শ্রমে উৎপাদিত সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে একক কোনো ধর্মাবলম্বীর জন্য নয়, সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের সকল শান্তিকামী-মুক্তিকামী বিশ্ববাসীর শত্রু। সেই শত্রু এবং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে ধ্বংসাত্মক আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দিচ্ছে-সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনসহ বিশ্বযুদ্ধকে ঠেকাতে পারে একমাত্র বিশ্ব জনগণ। কেননা, সাম্রাজ্যবাদী দেশ সমূহের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে অসংখ্য শান্তিকামী-প্রগতিশীল-মানবতাবাদী মানুষ রয়েছেন। যাদের মধ্যে জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ লেখক-গবেষক, শ্রমিক-কৃষক এবং তাদের সন্তান-স্বজনরাই সামরিক বাহিনীতে কর্মরত। তাই, মানুষ জাগলে, তারাও জাগবেন ও গণবিরোধী আদেশ অমান্য করে বিবেকের তাগিদেই ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবেন। তাঁরা জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে-‘অস্ত্র তাক করতে দ্বিধা করবেন না এবং বিজয় অর্জন পর্যন্ত জনগণের সাথেই থাকবেন। সবশেষে-শান্তিবাদী বিশ্ববাসীরই বিজয় নিশ্চিত হবে, প্রকৃতি-পরিবেশ সজীব হবে। বিশ্বের দেশে দেশে জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হোক, প্রতিটি দেশ হোক-সকল শ্রেনীপেশার, সকল ধর্মবর্ণের-জাতির মানুষের। এভাবেই শান্তির বিশ্ব হবে। ‘সৃষ্টির সেরা’ মানুষের কল্যাণে সৃষ্টিকর্তা সহায় হোন। সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক।Ñ সম্পাদনায় এসকে মজিদ মুকুল
আরও পড়ুন গণপ্রহরীতে

