গাইবান্ধার চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা যেন এখনো দূরর স্বপ্ন
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা:
ভোরের আলো ফোটার আগেই ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকা নামাতে হয় সালেহা বেগমকে। পানি ঠান্ডা, বাতাস ভারী। প্রসব বেদনায় কাতর সালেহার চোখে তখন ঘুম নেই- আছে ভয়। এই নদী পার হতে পারলেই হয়তো হাসপাতাল, না পারলে… বাকিটুকু কেউ উচ্চারণ করে না।
ফুলছড়ি উপজেলার খাটিয়াবাড়ী চরের সালেহা শেষ পর্যন্ত নদী পাড়ি দিতে পেরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সময়কে পেরোতে পারেননি। হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁর গর্ভের সন্তান আর বেঁচে ছিল না। নিঃশব্দে চোখ মুছতে মুছতে সালেহা বলেন, ‘চরেই যদি ডাক্তার থাকত, আমার সন্তানটা হয়তো বাঁচত।’
সালেহা একা নন। গাইবান্ধা জেলার ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে চার লক্ষাধিক মানুষের কাছে অসুস্থ হওয়া মানেই শুরু হয় এক অনিশ্চিত যাত্রা- নৌকা, বালুপথ আর সময়ের সঙ্গে লড়াই।
চিকিৎসা যেন দূরের কোনো শহরের গল্প
চরাঞ্চলে সূর্য ওঠে বালুর ওপর, কিন্তু হাসপাতাল ওঠে না। জ্বর-সর্দি, ডায়রিয়া কিংবা গর্ভাবস্থা- সব রোগের চিকিৎসা পেতে হলে চরবাসীকে ছুটতে হয় মূল ভূখ-ে। অনেক সময় সেই যাত্রা শুরু করার আগেই থেমে যায় জীবন।
ফুলছড়ি, সাঘাটা বা সুন্দরগঞ্জের চরাঞ্চলে এমন ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়। প্রসবব্যথায় ছটফট করতে থাকা নারী, শ্বাসকষ্টে ভোগা বৃদ্ধ কিংবা জ্বরে আক্রান্ত শিশু- সবাইকে যেতে হয় নৌকার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সময়মতো নৌকা না পাওয়ায় কিংবা পথে দেরি হওয়ায় অনেক প্রাণ ঝরে গেছে।
সাঘাটা উপজেলার কালুরপাড়া চরের আব্দুল করিম প্রামানিক বলেন, ‘চরের মানুষ অসুখ হলে আল্লাহর উপরই ভরসা। ডাক্তার তো দূরের কথা, একটা স্যালাইনও সহজে পাওয়া যায় না।’
প্রসূতি সেবা: সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
চরাঞ্চলে মাতৃত্ব এখনো এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। প্রয়োজনীয় প্রসূতি সেবা না থাকায় বহু নারী ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান জন্ম দেন। কেউ কেউ ভাগ্যবান হলে বেঁচে যান, কেউ হন না।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া চরের ফুলমতি বেগম বলেন, ‘শহরের মানুষ হাসপাতালে বাচ্চা জন্ম দেয়। আমরা জন্ম দিই ভয় নিয়ে- বাঁচব কি না, কেউ জানে না।’
চরের মানচিত্রে নেই হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেবা নেই
চরাঞ্চলে নেই কোনো স্থায়ী হাসপাতাল। কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখানে বেশির ভাগ সময় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। অনেক কেন্দ্রে ভবন আছে, কিন্তু নেই ডাক্তার, নেই পর্যাপ্ত ওষুধ, নেই জরুরি সেবা। ফলে অসুস্থ হলে চরবাসীর সামনে একটাই পথ- নৌকায় করে মূল ভূখণ্ডে যাওয়া।
বর্ষাকালে এই যাত্রা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। নদীর স্রোত, অন্ধকার রাত, ঝড়-বৃষ্টি- সব মিলিয়ে রোগী পরিবহন যেন এক ধরনের জুয়া। অনেক সময় রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান।
সরকারিভাবে চরাঞ্চলে কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হলেও স্থানীয়দের ভাষায় সেগুলো কাগজে-কলমেই বেশি সক্রিয়।
সদর উপজেলার কুন্দেরপাড়া চরের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত আসেন না। ওষুধ থাকে না। মানুষ এসে তালা দেখে ফিরে যায়।’
প্যারাসিটামল কিংবা খাবার স্যালাইনের জন্যও চরবাসীকে নদী পাড়ি দিতে হয়- যা অনেক সময় অসুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
চিকিৎসক সংকট
চরাঞ্চল সংলগ্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও চিকিৎসক সংকট প্রকট। অনেক উপজেলায় অর্ধেকের বেশি চিকিৎসকের পদ শূন্য। কোথাও সার্জন নেই, কোথাও অ্যানেস্থেশিস্ট নেই, আবার কোথাও গাইনি বিশেষজ্ঞ নেই। ফলে অস্ত্রোপচার, সিজারিয়ান বা জরুরি চিকিৎসা কার্যত অচল।
জেলা সদর হাসপাতালেও একই চিত্র। শয্যা বাড়ানো হলেও চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বাড়েনি। রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে চিকিৎসাসেবা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্য বৈষম্যের চরম উদাহরণ
চরবাসীর এই দুর্দশা আসলে স্বাস্থ্য বৈষম্যের এক নগ্ন চিত্র। মূল ভূখণ্ডের মানুষ যেখানে সহজেই চিকিৎসা পায়, সেখানে চরবাসীর জন্য অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা। দারিদ্র্য, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও চিকিৎসা সংকট একসঙ্গে মিলে চরাঞ্চলের মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে চরম ঝুঁকির দিকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরাঞ্চলকে আলাদা বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা না করলে এই সংকট কখনোই কাটবে না।
নদী এখানে শুধু জীবিকার উৎস নয়, জীবনের সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকিও। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা- এই তিন নদীর বুকে জেগে ওঠা গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বসবাস করেন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই মানুষগুলো বছরের পর বছর বেঁচে আছেন প্রায় কোনো কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ছাড়া।
গাইবান্ধা জেলার আয়তন প্রায় ২ হাজার ১৭৯ বর্গকিলোমিটার। সাতটি উপজেলার ৮১টি ইউনিয়নের বড়ো একটি অংশই নদীঘেরা চর। প্রতি বছর নদীভাঙনে ভৌগোলিক অবস্থান বদলায়, বদলায় মানুষের ঠিকানা। কিন্তু বদলায় না চিকিৎসা সংকটের চিত্র।
সরেজমিনে গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ বালুপথ মাড়িয়ে নৌকায় নদী পার হওয়ার অনিশ্চিত যাত্রা। দুর্গম যোগাযোগ, অকার্যকর কমিউনিটি ক্লিনিক ও জনবল সংকটে প্রসূতি সেবাসহ ন্যূনতম চিকিৎসাও মিলছে না ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-তিস্তার চরে। গাইবান্ধা জেলার ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে বসবাসকারী অন্তত চার লক্ষাধিক মানুষ বছরের পর বছর ধরে টেকসই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে প্রসবকালীন জটিলতা- সব ক্ষেত্রেই চিকিৎসা পেতে নদী পাড়ি দেওয়া চরের মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে জীবন-মরণের লড়াই। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, জনবল সংকট এবং কার্যত অচল কমিউনিটি ক্লিনিক এই জনপদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
গাইবান্ধার চরাঞ্চলের স্বাস্থ্য সংকট শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়। অবিলম্বে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই সংকটের চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। চরবাসীর দাবি স্পষ্ট- ভোটের সময় যেমন প্রার্থীরা চরে আসেন, চিকিৎসাসেবাও যেন তেমনি তাদের দুয়ারে পৌঁছে যায়।
চরবাসীরা স্পষ্ট করে তাদের দাবির কথা জানাচ্ছেন- চরাঞ্চলে স্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পূর্ণসংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ, ২৪ ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসাসেবা, নৌকা, অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপদ রোগী পরিবহন ব্যবস্থা, ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করতে হবে।
চর বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস সালাম মনে করেন, ‘মোবাইল হেলথ ইউনিট, বোট অ্যাম্বুলেন্স এবং স্থানীয় যুবকদের প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।’
জেলা সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান বলেন, ‘চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম। তবে আমরা চরের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছি।’
অপেক্ষায় চর, অপেক্ষায় মানুষ
গাইবান্ধার চরাঞ্চলের এই মানুষগুলো উন্নয়নের গল্প শোনে দূর থেকে। হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার- সবই যেন নদীর ওপারের কোনো শহরের বিষয়। অথচ এই নদীর মাঝেই প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে জীবন, হারাচ্ছে জীবন।
চরবাসীর দাবি খুব বড় কিছু নয়। তারা শুধু চায়- অসুখ হলে যেন নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যেতে পারে।
নদী যেমন তাদের ঘিরে রেখেছে, তেমনি রাষ্ট্রও যদি একটু কাছে আসে- তবেই হয়তো চরের মানুষের অসুখ আর মৃত্যুর গল্পগুলো বদলাতে শুরু করবে।
নদীভাঙন যেমন চরবাসীর ঘর কেড়ে নেয়, তেমনি চিকিৎসা সংকট কেড়ে নিচ্ছে জীবন। সংবিধান যেখানে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করেছে, সেখানে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষ এখনো সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত।
চরবাসীর জীবন যেন আর নৌকার দোলায় দোলায় শেষ না হয়- এই দায় শুধু চরবাসীর নয়, রাষ্ট্রেরও। এখন দেখার বিষয়, নদীর মাঝখানে আটকে থাকা এই মানুষগুলোর আর্তনাদ কবে নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছায়।
আরও পড়ুন-
জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে নিরক্ষর কুদ্দুস পথ প্রদর্শকই বটে (!)

