Tue. Feb 10th, 2026
জাতির বহুল প্রত্যাশিত শঙ্কাহীন নির্বাচনই কাম্য, তবে-

গণপ্রহরী রিপোর্ট : আজ ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে নির্বাচনি প্রচার কাজ বন্ধ হয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি পর্ব জানান দিচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত। প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসের দৃঢ় ঘোষণা মতে ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং নির্বাচনি ইতিহাসে এই নির্বাচন ‘মাইল ফলক’ হিসেবে বিবেচিত হবে। সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এক লাখ সেনা সদস্যসহ ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশজুড়ে মেতায়েন। তবেÑ
অভিধানে ‘যদি, তবে ও কিন্তু’ শব্দগুলোর যে কোন শব্দই গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণও বটে। শিরোনামের ‘তবে’ শব্দটি দু’চার কথায় হলেও ব্যাখ্যা না থাকলে, কে কোনদিকে নিয়ে যাবে তার ঠিক নেই। সেহেতু এক্ষেত্রে ‘তবে’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে-নির্বাচন হবে কিনা এ নিয়ে আগেই সন্দেহটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। উগ্রহিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার শাসিত প্রতিবেশী সম্প্রসারণবাদী ভারতের মদদপুষ্ট-পরাজিত শক্তি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে অগণিত নেতা-কর্মী-সমর্থকদের রেখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়ে, নির্বাচন বানচাল করে অন্তবর্তী সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিল। সশস্ত্র মহড়াও দিচ্ছিল। কিন্তু যে দলগুলো ক্ষমতাচ্যুত প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ভারতের অনুগত সরকারের পতন ঘটিয়েছে, সেই দলগুলো নির্বাচনের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে থাকায়, আংশিক নিষিদ্ধ ঘোষিত দল মাঠে জায়গা নিতে বেকায়দায় পড়েছে। পাশাপাশি লক্ষণীয় যে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও হুশিয়ারি নির্বাচন বানচালকারীদের অপতৎপরতারোধ শুধু নয়, সমূলে উৎখাত করে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে তৎপর থাকায় অপতৎপরতাকারীরা আত্মগোপনে থাকতেও নিরাপদ মনে করছে না। এদিকে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থানে এবং নির্বাচন কমিশন অঙ্গিকারবদ্ধ হওয়ায় নির্বাচন বানচালকারীদের অপতৎপরতা স্থিমিত হয়ে পড়েছে অর্থাৎ ‘ছেড়ে দে মা কেঁন্দে বাঁচি’ অবস্থায় দিন কাটছে।
তবে, ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনি প্রচারে সকল দল ও জোটের প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও অর্থ-সম্পদে বলিয়ান হলেও একই অঙ্গে কত রূপের ন্যায় ভূমিহীন-গরীব-সর্বহারা, কৃষক-শ্রমিক-কর্মচারীসহ বেকারত্বের অভিশাপে অভিশপ্ত শ্রমজীবি-কর্মজীবি মানুষের সাথে কতনা বিনয়ের সাথে কথা বলেছেন (!) জোড় হাত করেও অনেকে ভোট প্রার্থনা করেছেন, কতনা কথার বা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি বইয়ে দিয়েছেন। এমনভাবে ব্যক্ত করেছেন দুনিয়ার যত সুখ সবই যেন ভোগ করা যাবে ভোট নামের নির্বাচনে প্রার্থীদের মতো দেশ সেবকরা নির্বাচিত হলে। এতে ১৮ কোটি বলবো না, দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য যেন বহুল আেলোচিত ভারতের সীমান্ত ঘেরা কাঁটাতারে ফেলানীরি ঝুলন্ত লাশের মতো ঝুলে থাকলো (!) যদিও সেই ভাগ্য বদলের কর্মসূচি নামের মুলা ঝুলিয়ে রাখলেন দেশ সেবক প্রার্থীরা। তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে চাই-যুগ ও সময় বদলেছে। তাই ভোটার জনগণকে দেওয়া কথা বা প্রতিশ্রুতি লংঙ্ঘন করবেন না। আমাদের দেশের শ্রমজীবি-কর্মজীবি সকল সাধারণ মানুষই খুবই সহজ-সরল। যদিও কয়েক দিনের একটানা ভোট প্রার্থনায় ব্যস্ত থাকায় ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই ঘুমিয়ে পড়বেন না। মনে রাখবেন ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। সর্বজন স্বীকৃত যে, সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার সেরা সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সমাজতন্ত্রের সাইনবোর্ডধারী সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও চীন এবং সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্রীয় চরিত্র বাতিল করে স্বঘোষিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার খায়েশে দিশেহারা ‘ভারত’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনীতিতে স্ব স্ব দেশের প্রভাব সৃষ্টির প্রতিফলন ঘটিয়ে তাদের আধিপত্য বিস্তার ও বাজার দখলের পথ উন্মুক্ত করে রাখতে তৎপরতা অব্যাহত। তবে এবার নতুনবাবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট পাকিস্তান ও তুরুস্ক। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহনকারীদের কোনো পক্ষ যাতে বাইরের কোন শক্তির মদদপুষ্ট হয়ে ক্ষমতার অতি লোভে যেন নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করতে না পারে।
একজন জনযুক্তি নির্ভর লেখক-গবেষকের লেখার সুত্র ধরে আলোচনায় এসেছে নব্বইভাগ মুসলমান ভোটারের ভোট পেতে- মুসলমানের পরিচয় পোশাকেহেতু অনেক দেশসেবক প্রার্থীদের মাথায় এখন টুপি ও ঘোমটা। তাঁর কথায় দেশে টুপির উৎপাদন ও বিপনন বেড়ে গেছে মনে হয়। পণ্যের পসরা নিয়ে এতদিন হাজির হয়েছেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা। কেউ মিটাবেন ইহকালের চাহিদা। কেউ দিবেন পরকালের চিরস্থায়ী সুখের টিকেট। আর এই ভোট যুদ্ধে জেতা মানেই যেন হাতে স্বর্গ পাওয়া। যে জিতবে সে পাবে দুনিয়ার স্বর্গ, আর যে হারবে স্বর্গ থেকে তার পতন। সেই ভোটকে নিজের মতো ব্যবহার করতে গিয়ে ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতে পলায়ন। এহেন কুটকৌশলী পথ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে সকলকে। যদিও একাত্তর বলছে- ‘৯০ ভাগ মুসলমান মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারী ধর্ম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধকে সফল করতে ভুমিকা রেখেছেন। তাঁরা ধর্মভীরু হলেও ধর্মান্ধ নন বলেই সম্ভব হয়েছে ভবিষ্যতেও হবে।
সুষ্ঠ-নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন হোক- এ কামনা করে দুটো কথা বলেই আজকের মতো এখানেই ইতি টানতে চাই। স্মরণ সাপেক্ষে যে, দেশ ও জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণ চাইলে বা দেশ ও জনগণের সত্যিকারের সেবক হতে চাইলে শেষ মুহুর্তে হলেও- ‘সহিংস্রতা-সংঘাত, হানাহানি ও রক্তপাত’ যেমনি বন্ধ ঘোষণা করতে হবে, তেমনি ক্ষমতার সীমাহীন লোভও পরিত্যাগ করে জাতীয় ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়ে শেষ মুহুর্তের ভোট প্রার্থনায় বলুন- ‘আপনাদের রায় পেলে জাতীয় সরকার গঠনে উদ্যোগ নিবো। আপনার রাজনৈতিক ভূমিকার আলোকে আশাতীত জনসমাবেশে বা জনজোয়ার দেখে অগণাতন্্িরতক মানসিকাতয় উজ্জীবিত হয়ে- যে ভাবেই হোক জিততে হবে- এমন মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে। চীনের চেয়ারম্যান মাওসেতুঙ বলেছেন, জনগণ, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। যে উক্তিটি ঘন ঘন পুর্নব্যক্ত করেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহম লিংকন বলেছেন, জনগণকে উপেক্ষা বা জিম্মি করে তাদের লাশ বানিয়ে আত্মীয়স্বজন ও পরিবারে শোকের মাতম তুলে হয়তোবা ক্ষমতায় যাওয়া যায়, তাতে দেশ ও জনগণের জন্য যেমন সুফল বয়ে আনেনা, তেমনি যারা এ ধরণে গর্হিত কাজে জড়িত তাদের ভবিষ্যতও ভাল হয় না। যেমনটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ভাগ্যে হয়েছে।
সুষ্ঠ নির্বাচনের সম্ভাবনা বাস্তব হতে যাওয়ার শেষ মুহুর্তেও জনমনে সন্দেহজনক ভাবনা দোলা দিচ্ছে। কারন এবার কেউই যে অনুমান করতেই পারছেন নাÑ কোন বা কোন জোট কতগুলো আসন পাওয়ার সম্ভবনা দেখেছে। তবে নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের দৌড়ে জনযোক্তিকভাবে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রের জ¦াল যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে শেষ মুহুর্তে নির্বাচন না হওয়ার অশনি সংকেতের সিগন্যালের হলুদ আলো মিটিমিটি জ¦লতে শুরু করেছে। আর অনাকঙ্খিত কোনো ঘটনা প্রেক্ষিতে যদি ‘ভোট পাহারা’ দেওয়ার পরিবেশ তৈরী হয়, তাহলেতো ভোটের ফলাফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শেষ মুহুর্তে এমন কথা বলা-মন্তব্য করা যাবে না, বা এমন কাজ করা যাবে না, যা বললে বা করলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। তাই কথা বলা বা কাজ করার আগে ভাবতে হবে কথা বা কাজটির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। সে কথা বা কাজে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে বা জাতীয় ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে-কি, হবে না। সে কারণে সর্বক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং ধৈর্যশীল হতে হবে। কেননা, ব্যক্তির উর্ধ্বে সংগঠন আর সংগঠনের উর্ধ্বে দেশ এবং দেশের স্বাধীনতা-সাবভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা। আত্মসমালোচনাকে পাথেয় করতে হবে। এ মুহুর্তে বার বার বলতে চাই- আর কোনো ‘তবে’ নয়, জাতির বহুল প্রত্যাশিত শঙ্কাহীন নির্বাচনই কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *