Thu. Mar 26th, 2026
তাৎপর্যপূর্ণ দুটি দিবস নিয়ে আমাদের কথা

গণপ্রহরী ডেস্ক : আজ ২৬ মার্চ ৫৬তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ঐতিহাসিক মাসের স্বাধীনতা দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণ করছে জাতি। রক্তার্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ, আমাদের মাতৃভূমি যাঁদের আত্মত্যাগ ও যাঁদের ত্যাগের মরণপণ সফল যুদ্ধের জন্য আজকে স্বাধীনতা নিয়ে সম্পাদকীয় লিখতে পারছি সেই সব বীর শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে, তাঁদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। সম্মান জানাচ্ছি ত্যাগের মরণপণ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের। সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছি।

পৃথিবীর যে কোন দেশের কোন মানুষ, জাতি ও দেশের কাছে স্বাধীনতা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেনইবা আমাদের জন্য তা হবে না। একটি খাঁচায় বন্দি পাখীকে ছেড়ে দিলে দেখা যায়, খাঁচায় দীর্ঘসময় বন্দি থাকায় অন্য পাখীদের মত উড়তে না পারলেও, তার উড়ে যাওয়ার দৃশ্যই বলে দেয়-‘পাখিটি স্বাধীন ও মুক্ত’। সেক্ষেত্রে আমরাতো মানুষ। আমরা বাংলাদেশের বাঙালী মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে স্বাধীনতার মাস ও স্বাধীনতা দিবস অন্যদের চেয়ে বেশি বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আমাদের দেশের স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। মহান ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জোব্বার ও শফিউর প্রমুখদের রক্তভেজা মাটিতে রোপীত হয়েছিল। অথচ বৃটিশের উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হয়েছিলাম মাত্র তার পাঁচ বছর (১৯৪৭) আগে। দুইশত বছরের উপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম, সে স্বাধীনতা বাংলাদেশী মানুষের জন্য নয়। এ উপলব্ধি করেছিল এই জাতি, ১৯৪৮ সালেই। অর্থাৎ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর প্রধান কায়েদে আযম আমার মায়ের মুখের বাংলা ভাষাকে উপক্ষো করে একমাত্র উর্দুভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনস্বার্থবিরোধী এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনচেতা ও মুক্তিকামী বীর বাঙালীর দামাল সন্তান ছাত্ররা প্রতিবাদে মুখোরিত হয়ে ওঠেন। শুরু হয়-সম্ভাব্য আন্দোলন-সংগ্রাম, যার চুড়ান্ত রূপ বায়ান্নতে। শহীদদের রক্তস্রোতের ফলশ্রুতিতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি পায়।

কিন্তু রাজনৈতিক সচেতন বোদ্ধা ছাত্র-জনতার কানে ঠিকই পড়েছিল, শহীদের রক্তস্রোতের শব্দে উচ্চারিতÑ’ভাষার স্বীকৃতি যেহেতু এসেছে রক্তে, সেহেতু এখন চাই পূর্ববাংলার মানুষের জন্য ¯¦াধীন ভ’খন্ড, জন্মভূমির স্বাধীনতা। অবসান চাই দেশী-বিদেশী শাসন-শোষনের। এজন্য প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধ করতে হলে তা করার মধ্য দিয়েই রক্তার্জিত বিজয় অর্জন করতে হবে। কেননা, বীজ রোপিত বায়ান্নর শহীদের রক্তে ভেজা মাটিতে। তাই আত্মত্যাগে বলিয়ান হয়ে সেই রক্ত পথ বেঁয়ে এগিয়ে যেতে হবে সামনে। একজন মনিষী বলেছেন, কোন আত্মত্যাগই বৃথা যায় না। তাইতো আকারে-প্রকারে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন হাঁটি হাঁটি পা পা করে আগাতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতেই বাঙ্গালীদের শিক্ষার প্রতি-‘মৌলবাদীদের মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার পথ সংকীর্ণ করার হীনমানসিকতায়, বাষট্টিতে চাপিয়ে দেয় হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট। এই ঘাতক রিপোর্ট বাতিলের দাবীতে ছাত্ররা সংগঠিত হতে থাকে। আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৯-এ। শহীদ আসাদ ও শহীদ মতিউরসহ নামজানা না জানা শহীদদের রক্তপথে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন-গণঅভ্যূত্থানে পরাজয় ঘটে সামরিক জান্তা- লৌহমানব খ্যাত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব শাহীর দাম্ভিকতার শাসনের। গণআন্দোলন-গণঅভ্যূত্থানের শহীদদের রক্তে ভেজা মাটিতে অংকুরিত হয় ও দ্রুত সতেজতা নিয়ে বাড়তে থাকে বায়ান্নতে রোপীত স্বাধীনতার বীজ। শহীদদের রক্তপথে পরিচালিত গণআন্দোলন-গণঅভ্যূত্থানের গণস্রোতে ‘আগরতালা ষড়যন্ত্র’ খ্যাত মামলায় বন্দিদের রাখা বন্দিশালার লৌহকপাট ভেসে যায়, ভস্মিভূত হয় মামলার রেকর্ডপত্র। মুক্ত হয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল বন্দিরা। তখন আইয়ুব শাহীর স্থলে ক্ষমতাসীন সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাধ্য হলেও শর্তসাপেক্ষে গণভোট দেয়। তবে গণভোটের ছদ্মাবরণে নতুনভাবে তাদের পরিকল্পনার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জাল বিস্তার করে। ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ শতকরা ৯৯টি আসন লাভ করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর করে না পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি। কিন্তু ওরা মার্কিনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ ও সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের (ওদের ভাষায় পূর্ব পাকিস্তানের) সকল বাঙালী মানুষ হত্যা করে বাংলার রক্তাক্ত মাটি দখলের নেশায় নেশাগ্রস্থ হয়। তবে ক্ষমতার লোভে ভুলে যায় এ দেশের স্বাধীনতার কথা, স্বায়ত্বশাসনের কথা যা অনেক অনেক পুরোনো। আর পুরনো কারণেই বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে হলেও প্রস্তÍতিও ছিল। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ জনগণকে ঘর থেকে বের করে যুদ্ধের মহড়ায় সামিল করে। ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্রভাবে প্রস্তÍুতি নিতে থাকা প্রগতিশীলদের। এ কারণেই ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে উল্লেখ্য দাবীদার। গোলটেবিল বৈঠকের নামে ইয়াহিয়া ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য অধিক সেনা ও অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) পৌছার পর, ভূট্টোকে সাথে নিয়ে ইয়াহিয়া খান বিশেষ বিমানে যাবার প্রাক্কালে, বাঙালী হত্যা করে রক্তাক্ত মাটি চাওয়ার নির্দেশ দিয়ে চলে যায়। নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালীদের হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। যে বাস্তবতায় দামাল সন্তানদের মরণপণ যুদ্ধে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নির্লজ্জ পতন ঘটে। তাই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক দাবীদার। ঐতিহাসিক এবং জাতীয় ও স্বাধীনতা দিবস তাৎপর্যপূর্ণ; মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য অর্জিত হোক এই আশাবাদ থাকছে। আর মার্চ মাসেই রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি তারিখ। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস, এ কারণে মার্চের এই তারিখটিও আন্তর্জাতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ন। 

গণপ্রহরী পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *