গণপ্রহরী ডেস্ক : আজ ৮মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। এবার দিবসটি এসেছে প্রশ্ন নিয়ে। তাতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস খ্যাত ‘বিশ্ব শ্রমজীবি নারী দিবসে’র জিঙ্গাসা-‘নারীরা কেমন আছেন (?)’ মা জাতির নারীদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা ও অধিকার ভিত্তিক ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘রক্তার্জিত নারী দিবস’হেতু নারীদের নিয়ে জিঙ্গাসাই স্বাভাবিক। ‘জিঙ্গাসাটা’ যেহেতু শিরোনাম দখল করেছে, সেহেতু উত্তরটাই পাঠকের আগে প্রয়োজন। যদিও উত্তরটা আমরা এদেশের সবাই জানি ও বুঝি। এবং আমরা প্রত্যেকে চারদিকে তাকালেই বাস্তবতাই বলে দিবে। তারপরও প্রাসঙ্গিক আলোচনাতো করতেই হবে।
আমাদের এই রক্তার্জিত দেশে আপামর মানুষের জন্ম থেকেই চাওয়া পাওয়া যেহেতু ৫৫ বছরেই পূরণ হয়নি, সেহেতু নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়তো সুদূর পরাহত। তারপরও আশা নিয়েই মানুষ। সেই আশা থেকেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস খ্যাত ‘বিশ্ব শ্রমজীবি নারী দিবস’ কেন ও দিবসটির স্বীকৃতি আদায়ে আত্মবলিদানকারী ও নেতৃত্বদানকারীদের ‘আত্মাত্যাগ ও ত্যাগতিতিক্ষার’ বিষয়ে পাঠকের সাথে মত বিনিময়ে রক্তার্জিত ৮ মার্চ নিয়ে অতিসংক্ষিপ্ত আলোচনা। আলোচনার শুরুতেই যাঁদের আত্মত্যাগে ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ বিশ্বের জানি দুষমন ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা’র নিউইয়র্ক শহরে সকল বিধিনিষেধ-কালাকানুন ও পুলিশী ব্যুহ বা বেরিকেড ভেঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সংগ্রামী মা জাতি নারীদের প্রতি ‘তাক করে’ উচিয়ে রাখা বন্দুকের (রাইফেল) নল উপেক্ষা করে, আত্মবলিদানসহ নানা অত্যাচার নির্যাতন মাথায় নিয়েই সমবেত হয়ে সফল করেছিলেন সমাবেশকে; তাঁদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ১৯১০ সালে আন্তর্জাতিক সোশালিষ্ট কংগ্রের অধিবেশনে ৮ মার্চকে সর্বহারা নিপীড়িত শ্রমজীবি নারীদের ৮ ঘন্টা শ্রম ৮ঘন্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘন্টা বিনোদনসহ নারীদের মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের প্রতীক দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব উত্থাপনকারী মহিয়সী নারী কমরেড ক্লারা সেৎকিনের প্রতি। সেই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায়ই সারা বিশ্বের দেশে দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে।সেদিনের সংগ্রামী নেতৃত্বের বিশ্লেষনে বেরিয়ে এসেছে যে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সামন্ত প্রথাকে লালন করতো কারণেই, ১৯০৮ সালের ৮ মার্চের শ্রমজীবি নারীদের আন্দোলন; সমাজ ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মুলতপাটন করেই নারী অধিকার ও নারী মর্যাদা প্রতিষ্টা করবে’। তাঁদের বিশ্লেষনের ভিত্তি ছিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদ খ্যাত তত্ত্ব। সেই তত্ত্বের ‘এক বিন্দু’র লাখো কোটি ভাগের একভাগের এক শতংশের .১ভাগ ।
মহান লেনিনের মতে, রুশ অক্টোবর বিপ্লবের মূল কথাই হলো রাজনীতির মধ্যে তাদের আনয়ন, যারা পুঁজিবাদে বেশী নিপীড়িত। তাদের দলিত,প্রতারিত ও লুন্ঠিত করে পুজিপতিরা রাজতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক-বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র উভয় আমলেই। ভূমি ও কলকারখানার উপর ব্যক্তি মালিকানা যতদিন থাকছে, ততদিন পূঁজিপতিগন কর্তৃক জনগণের পরিশ্রমের এই পীড়ন, এই প্রতারণা, এই লুন্ঠন অপরিহার্য। বলশেভিজমের সার কথায়, সোভিয়েত রাজের সার কথাটা হলো-বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকতার মিথ্যা ও ভন্ডামির মুখোস খুলে, ভূমি-কলকারখানার উপর ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ করে মেহনতি ও শোষিত জনগণের হাতে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংহতি। এরা নিজেরাই, এই জনগনই নিজের হাতে তুলে নিয়েছে- নতুন সমাজ নির্মানের রাজনৈতিক কাজ। মহান লেনিণের মতে, নারীদের রাজনীতিতে না এনে জনগণকে রাজনীতির টেনে আনা সম্ভব নয় উল্লেখ করে কারণ হিসেবে বলেছেন, মানবজাতির নারী অর্ধেকাংশটা পজিুঁবাদের আমলে দু’গুণ পীড়নে পীড়িত। নারী শ্রমিক ও কৃষানীরা পুঁজির হাতে নিপীড়িত, তদুপরি, এমনকি বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রগুলির সবচেয়ে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রেও তারা থেকে যায়, প্রথমত, পূর্ণ অধিকারহীন হয়ে, কারণ আইন তাদের পুরুষের সঙ্গে সমতা দেয় না।’ এটাই বাস্তবতা হলেও লেনিনের মতে,কাজটা কঠিন, জনগন পুঁজিবাদের হাতে বিধ্বস্ত ও দলিত, কিন্তু মজুরি দাসত্ব থেকে, পুঁজিপতিদের দাসত্ব থেকে বহির্গমনের অন্য কোনো পথ নেই, থাকতেই পারে না।
উপরোক্ত যুক্তিযুক্ত আলোচনার বিচার-বিশ্লেষণে বিশ্ব শ্রমজীবি নারীদের পক্ষে ৮ মার্চ, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জিঙ্গাসা-নারীরা কেমন আছেন’ শিরোনামের বিষয়ক অতিসংক্ষিপ্ত আলোচনায় দেখি- কি উত্তর পাওয়া যায়। উত্তর কিন্তু সহজ। সেই সহজ উত্তরটা সোজা সাপ্টা কথায় বলা যায়- শ্্েরণী বিভক্ত সমাজের আকাশ-পাতাল বৈষম্যের শিকার নারীদেরকে শিরোনামের ‘ জিঙ্গাসা’টা করার আগে জানা যাক-বিবেক কি বলে। বিবেক বলছে, নারীদেরকে জিঙ্গাসা কেন; চারদিকের বাস্তবতাতো বলছে দেখে-শুনে, জেনে-বুঝেও না বোঝা, না দেখা ও না শোনার ভান করাই হচ্ছে নারীদের জিঙ্গাসা করা। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশ- প্রচার হচ্ছে-শিশু কন্যাসহ নারী ধর্ষন ও ধর্ষন শেষে হত্যা-খুন-গুমের লোমহর্ষক খবর।নারীরা কোথায়ও নিরাপদ নয় তাই স্বীকার্য যে, এহেন প্রশ্ন করা অবান্তর।
অথচ বায়ান্ন থেকে চব্বিশ, দেশের প্রতিটি আন্দোালনে সাহসী ভূমিকা পালনকারী –নারীদের লাখো (আড়াই লক্ষাধিক) মা-বোনকে সম্ভ্রহারানোর বিনিময়ে এবং নারী মুক্তিযোদ্ধা সহ তাঁদেরই গর্ভজাত দামাল সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাজির মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাস স্বাক্ষ্য দিচ্ছে এবং বাস্তবতাও চোখে আঙুল দিয়ে দিয়ে দেখিয়ে যা বলছে- সেটা শুনে, জেনে, দেখে নেই। বাস্তবতা বলছে-সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র নারীরা একদিকে সন্তান লালন পালনসহ গৃহকর্মে বিপর্যস্ত, অপরদিকে কর্মক্ষেত্রে নারীরা হচ্ছে নিষ্পিষ্ট। সবমিলে নারীরা যেন মানুষ নয়, যৌন উপভোগের ও বানিজ্যিক প্রসার- প্রচারের ক্ষেত্রে দেহ প্রদর্শণের পণ্য-সামগ্রী। সেই সহজ উওরটা সোজা সাপ্টা কথায় বলা যায় নারীর জন্মই যেন সন্তান লালন-পালনের আর রান্নাবান্নার জন্য, পাশাপাশি পরিবারের সেবার জন্য। পরিবারের সবার সেবা দিতে দিতে নিজের প্রতি যত্ন নেয়ার সময়টুকু জোটে না; তার যত্ন নেয়ারও কেও থাকে না, অনেক অনেক পরিবারের। কিন্তু সংখ্যক পরিবারে কেও থাকলেও ভাগ্যবান নারীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে খুব একটা কমতি নেই। রোগব্যাধি বা সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেয়ার-আনার অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একট-আধটু বিশ্রামের সময় জোটে ভাগ্যে। উপরন্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় স্বামীর নিপীড়নের পাশাপাশি শিশুর পরিবারের নির্যাতনও সহ্য করতে হয়, অনেক অনেককে। এতদসঙ্গে লেখার পরিসমাপ্তি টানতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবর্গ ও সংসদ সদস্যবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক আশাবাদ ব্যক্ত করছি নতুন সরকারের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীরা যেন মানুষ-নাগরিক হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতাদি প্রাপ্তদের নারীদের জীবিকার সহয়তা হলেও কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকারসহ যথাযথ মর্যাদা ও সমঅধিকার ভোগের নিশ্চয়তা পান। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘পৃথিবীতে যত সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী-অর্ধেক তার নর’ মূল্যবান উক্তিটি স্বরণ করিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে ইতি টানছি।–সম্পাদনায় এসকে মজিদ মুকুল

